মির্জাপুরে স্মৃতি স্তম্ভ অর্জনে মোমবাতি প্রজ্জলনের মধ্য দিয়ে হানাদার মুক্ত দিবস পালন

মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল
স্মৃতি স্তম্ভ অর্জনে মোমবাতি প্রজ্জলনের মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর হানাদার মুক্ত দিবস পালিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন এ মোমবাতি প্রজললনের আয়োজন করে। সন্ধ্যার পর উপজেলা পরিষদ চত্তরের সমানে বীর মুক্তিযোদ্ধা, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ মোমবাতি প্রজ্জলনের সময় উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদার মুক্ত হয় মির্জাপুর উপজেলা। দীর্ঘ ৮ মাস ১০ দিন যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পাকহানাদারদের আত্মসমর্পনের মাধ্যমে মির্জাপুরের আকাশে বাতাসে হেমন্তের দ্বিপ্রহরে উড্ডীয়ন হয় সবুজ জমিনের উপর লাল সূর্য খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এই পতাকা এমনি আসেনি। এর জন্য মির্জাপুর বাসিকে দিতে হয়েছে অনেক রক্ত এবং পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে অনেক সম্মুখ যুদ্ধে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রবীন বীর মুক্তিযোদ্ধা সরকার হিতেশ চন্দ্র পুলকসহ একাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা জানান, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক আহবানে সারা দিয়ে টাঙ্গাইলে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ এবং হাইকমান্ড। এর নেতৃত্বে ছিলেন প্রয়াত সাবেক গণপরিষদ সদস্য ও টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ফারুক, সাবেক সাংসদ প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত একাব্বর হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আজাদ কামাল এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম। ২৬ মার্চের ওয়ারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষনা। ৩রা এপ্রিল ঢাকা-টাংগাইল মহাসড়ক সংলগ্ন গোড়ান সাটিয়াচড়ায় পাকসেনারা আসামাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা নর ঘাতকদের উপর গুলি চালায়। দীর্ঘ সম্মুখ যুদ্ধে ১০৭ জন মুক্তিপাগল বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয় এবং ইপিআর নিহত হয় ২৩ জন। ৩৫০ জন পাকবাহিনী হতাহতের পর গোড়ান সাটিয়াচড়া মুক্ত হলেও পাকসেনারা ঘাটি করে বসে উপজেলা সদর এবং ভড়রা ও নরদানা গ্রামে। পাকসেনারা আশেপাশের গ্রামে লূটপাট আর অগ্নিসংযোগ করে নিরীহ ২৮ জন বাঙ্গালীকে হত্যা করে। ৭ মে দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা, তার একমাত্র পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা এবং ৮ মে উপজেলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবুল হোসেনের বৃদ্ধ পিতা জয়নাল সরকারকে পুড়িয়ে হত্যা, মাজম আলী, মির্জাপুর ও আন্ধরা গ্রামের রাখাল চন্দ্র সাহা, সুদাম চন্দ্র সাহা, নিতাই মেম্বার, পান্না লাল, জগবন্ধু রায় সহ ৩৮ জনকে হানাদার এবং এদেশীয় দোসররা হত্যা করে লাশ লৌহজং নদীতে নিক্ষেপ করে। সে দিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে করে মির্জাপুরবাসি আজও কাঁদে। মির্জাপুরকে হানাদার মুক্ত করার জন্য ১৮ নভেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। ১২ ডিসেম্বর রাতে দেশমাতৃকার সূর্য-সন্তান বীর যোদ্ধারা মির্জাপুরের বংশাই, লৌহজং ও চতুর্দিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল সম্মুখ যুদ্ধ। আজাদ কামাল বীর প্রতীক, এম এ সবুর বীর প্রতীক ও রবিউল কমান্ডারের নেতৃত্বে ১৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় মির্জাপুর। প্রায় ৫শত মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকসেনাদের পরাজিত করে এবং পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা উড়িয়ে দেয় সবুজ জমিনের উপর লাল খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা। এমনিভাবে বহু রক্ত, ত্যাগ-তিতিক্ষার এবং সম্মুখ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৮ মাস ১০ দিন পর বংশাই, লৌহজং ও ধলেশ্বরী বিধৌত আজ থেকে ৫৪ বছর পূর্বে এইদিনে সম্পূর্নভাবে হানাদার মুক্ত হয়। মির্জাপুরবাসি ১৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত দিবসকে সরকারী ভাবে পালনের অনুরোধ জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ বি এম আরিফুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদার মুক্ত হয় মির্জাপুর। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষে উপজেলা প্রশসের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসন চত্তরে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্তম্বে অর্জনে বীর শহীদদের স্মরণে সন্ধায় প্রদীপ প্রজ্জলনের আয়োজন ছিল।

  • সাপ্তাহিক বারবেলা ডেস্ক

    Related Posts

    মির্জাপুরে কাইতলা পশুর হাট নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র বিপাকে ইজারাদার সরকারের রাজস্ব হারানোর আশংকা

    ৭ মে ছিল মির্জাপুর গণহত্যা দিবস , কুমুদিনী পরিবার ও হাসপাতালে নানা আয়োজন

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *