মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অবৈধভাবে গড়ে ইটভাটা বন্ধে এবং অবৈধ ভাবে মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসন কঠোর অভিযানে নেমেছেন। অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা ইটভাটায় ও অবৈধ ভাবে মাটি কাটা ও বালু মহলে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকা অর্থদন্ড প্রদান করেছেন। মামলা দায়ের করা হয়েছে অর্ধশত। সেই সঙ্গে অবৈধ ৯ ইটভাটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে অনিদিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত অভিযানের মামলা ও অর্থদন্ডসহ ৯ ভাটা বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্্িরকিউটিভ ম্যাজিষ্ট্রট এ বিএম আরিফুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার ভুমি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুর রহমান। সর্বশে আজ বৃহস্পতিবার দুইটি ইটভাটা চার লাখ টাকা অর্থদন্ড এবং দুইজন মাটি চোরকে এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকাসহ ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা অর্থদন্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদারতের বিচারক মাসুদুর রহমান।
পরিবেশ অধিদপ্তর টাঙ্গাইল অফিস সুত্রে জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলায় পৌরসভার আশপাশ ও ৯ টি ইউনিয়নে শতাধিক ইটভাটা রয়েছে। ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে এই ইটভাটা। সরকারি নিয়ম অনুসারে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন অধিদপ্তরের অনুমোদনক্রমে ইটভাটা স্থাপন করার কথা। কিন্ত মির্জাপুর উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটার পরিবেশ অধিপ্তর, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরের (ছাড়পত্র) অনুমোদন নেই। হাইকোর্টে রিট করে নানা কৌশলে ইটভাটা চলমান রেখেছে যা আইনগত ভাবে সঠিক নয়। একটি ইটভাটায় কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ একর তিন ফসলি আবাদী জমি ব্যবহার করা হয়েছে। তিন ফসলি জমিতে অবৈধ ইটভাটা গড়ে তোলায় ইটের কাল ধোয়ায় এলাকায় পরিবেশ মারাত্বক হুমকির মুখে। মরে যাচ্ছে গাছপালা। বিশেষ করে গোড়াই, আজগানা, তরফপুর, লতিফপুর ও বাঁশতৈল এই ৫ ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা মারাত্বক ভাবে হুমকির মুখে পরেছে। ইটভাটা পরিচালনার জন্য দিনে রাতে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড়ের লাল মাটি ও টিলা। প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘ দিন ধরে উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল আজগানা, লতিফপুর, তরফপুর, গোড়াই ও বাঁশতৈল এই পাঁচ ইউনিয়নের পাহাড়ের টিলার লাল মাটি চুরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মৌসুমের শুরু থেকেই পাহাড় ও নদীর মাটি এই মাটি কাটা হচ্ছে। দিনে-রাতে এই মাটি কাটায় এলাকার কাঁচা আধাপাকা রাস্তা ভেঙ্গে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পাহাড়ের লাল মাটি কাটায় এক দিকে জীব বৈচিত্র ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি ভাবে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আজগানা, লতিফপুর, তরফপুর, গোড়াই ও বাঁশতৈল পাহাড়ি এলাকার অসহায় ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র আজগানা, লতিফপুর, তরফপুর, গোড়াই ও বাঁশতৈল এলাকার অসহায় লোকজনকে জিম্মি করে জোর পুর্বক পাহাড়ের লাল মাটির টিলা ও ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। মাটি কাটা বন্ধের জন্য কেউ বাঁধা দিলে তাদের বিভিন্ন ভাবে হুমকি এবং মামলার ভয় দেখানো হয়। সন্ধার নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় পাহাড় কাটার মহোৎসব। প্রতি রাতে শতাধিক ড্রাম ট্রাক দিয়ে মাটি নেওয়ায় এরাকার রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। একই ভাবে মাটি চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রটি উপজেলার বংশাই ও লৌহজং নদীর মাটিও কেটে নিচ্ছে।অবৈধ ইটভাঁটার বিষয়টি জানতে পেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর গত ১২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত ছয় ইটভাঁটায় অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুলতানা সালেহা সুমি ভাটা ব্রিকজ, নিউ সরকার ব্রিকজ, নিউ রমিজ ব্রিকজ, হক ব্রিকজ, বি এন্ড বি ব্রিকস, সনি ব্রিকজ ও রানা ব্রিকস চিমনি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে ইটভাঁটার মালিককে চার লাখ টাকা করে ২৪ লাখ টাকা অর্থদন্ড দিয়ে ভাটা বন্ধ করে দেন।
গত ৯ জানুয়ারি উপজেলার বহুরিয়া গ্রামে আরবিসি ব্রিকস, এম এস বি ব্রিকস, ভাটা ব্রিকস, এইচ ইউ বি ব্রিকস, নিউ রমিজ বিক্রজ, রান ব্রিকজ, গোড়াই ইউনিয়নের মীর দেওহাটা গ্রামে সনি ব্রিকস ও বাইমাইল গ্রামে বি এন্ড বি ব্রিকসসহ সাতটি ইটভাঁটা চিমনি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি যৌথবাহিনী, পরিবেশ অধিদপ্তর ও এক্্িরকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে ৯ টি ইট ভাটা বন্ধ করে দিয়ে শরীফ হযরত ব্রিকসকে দুই লাখ টাকা এবং হাকিম ব্রিকসকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্্িরকিউটিভ ম্যাজিষ্ট্রেট এ বি এম আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযানে নিউ কে বি এম এর্ন্টারপাইজ ইটভাটাকে এক লাখ টাকা, মেসার্স আটলান্টিক ব্রিকসকে দুই লাখ টাকা, আকতার ব্রিকস কর্পোরেশনকে দুই লাখ টাকা, মেসার্স কে বি এম এর্ন্টারপাইজকে ৮৫ হাজার টাকা, মেসার্স হুমায়ুন ব্রিকসে ৯০ হাজার টাকা, মেসার্স লিমন ব্রিকস এন্ড ম্যানপ্যাকচারিংকে এক লাখ টাকা এবং মেসার্স নিউ দেওয়ান ব্রিকসকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি আবারও অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় মেসার্স এ এম ব্রিকসকে এক লাখ টাকা, এ আর ব্রিকসকে এক লাখ টাকা, রমিজ ব্রিকসকে ৬০ হাজার টাকা, আলহাদী ব্রিকসকে ৬০ হাজার টাকা, মেসার্স স্টাইল ব্রিকসে ৬০ হাজার টাকা, হাবিব ব্রিকসে ৫০ হাজার টাকা, মেসার্স কালাম ব্রিকসকে ৫০ হাজার টাকা, দেওয়ান ব্রিকসকে ৬০ হাজার টাকা এবং মেসার্স ফজলুল হক ব্রিককে ৬০ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করা হয়।সর্বশে আজ বৃহস্পতিবার ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক মাসুদুর রহমান ও পরিবেশ অধিপ্তরের পরিদর্শক বিপ্লব কুমার সুত্রধরের সহায়তায় অভিযানে অবৈধ ইটভাটা সলিমনগরের শাআলমের ইটভাটায় এক লাখ টাকা, মোস্তফা ইটভাটায় তিন লাখ টাকা, অবৈধ বাবে মাটিকাটায় মোহাম্মদ আলীকে ৭০ হাজার টাকা এবং সুজন মিয়াকে ৬০ হাজার টাকাসহ মোট ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করেছেন।
গত দেড় মাসের ব্যবধানে পৃথক ৬ টি অভিযান পরিচালনার সময় উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন, পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুলতানা সালেহা সুমি, টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন, সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভুমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাকিবুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভুমি) মাসুদুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিঞা মাহমুদুর হক, সহকারী পরিচালক সজিব কুমার ঘোষ, পরিদর্শক বিপ্লব কুমার সুত্রধরসহ সেনাবাহিনী, পুলিশ, আসনার, গ্রাম পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশনের কর্মীরা।
এ ব্যাপারে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্্িরকিউটিভ ম্যাজিষ্ট্রট এ বি এম আরিফুল ইসলাম এবং টাঙ্গাইল জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিঞা মাহমুুদুল হক বলেন, মির্জাপুরে অবৈধভাবে গড়ে উঠা ইটভাঁটাগুলো পরিদর্শন করে এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ইনফোর্সমেন্ট শাখায় সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নির্দেশনায় ট্যাক্্রফোর্সের সদস্যসহ যৌথবাহিনীর সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ ইট পোড়ানোর চিমনি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। ৪০ ইটভাটায় অভিযানে ৪৬ লাখ টাকা এবং অবৈধ ভাবে পাহাড়, নদী ও ফসলি জমির মাটি কাটায় ১৪ লাখ টাকাসহ ৬০ লাখ টাকা অর্থদন্ড প্রদান করা হয়েছে। মামলা হয়েছে অর্ধশত। জনস্বার্থে ও পরিবেশ রক্ষায় তাদের এ অভিযান চলমান থাকবে বলে উল্লেখ করেন।







