মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মডার্ন হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার (প্রাইভেট) হাসপাতালে টনসিলের ভুল অপারেশনে তাসরিফা আক্তার (১০) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুল অপারেশনে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বজনরা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ভাংচুর চালায়। এ সময় হাসপাতালের চিকিৎসক ও পরিচালকসহ নার্সরা পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হাসপাতালের পরিবেশ শান্ত করেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে উপজেলা সরকারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্র থেকে একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আজ শনিবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্েরর সেনেটারী পরিদর্শক ইসরাত জাহান মডার্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করে রোগীর যাবতীয় কাগজপত্রসহ ঠিকানা ও আলামত সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। প্রাইভেট হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও অপারেশনে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় তোলাপার শুরু হয়েছে। শিশুর পরিবার ও এলাকাবাসি তদন্ত সাপেক্ষ দায়দের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জোর দাবী জানিয়েছেন। আজ শনিবার (২৬ জুলাই) মির্জাপুরে মডার্ন হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার (প্রাইভেট) হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে শুনশান নিরবতা।
জানা গেছে, তাসরিফা দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটি ইউনিয়নের পাচুটিয়া গ্রামের পারভেজ মিয়ার মেয়ে। গতকাল শুক্রবার সকালে তার পরিবার শ^াসকষ্ট এবং খাদ্য গ্রহনে (শ^াসনালিতে) সমস্যা নিয়ে মির্জাপুর মডার্ণ হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তাসরিফাকে ভর্তি করেন। চিকিৎসকগন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শিশুর পরিবারকে জানান, তাকে দ্রুত অপারেশন করতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শে দুপুর দেড়টার দিকে হাসপাতালের আ্যানেসথেসিয়া মো. সাইফ আব্দুল্লাহ শিশু কন্যা তাসরিফাকে অজ্ঞান করেন। এর একটু পরে হাসপাতালের নাক-কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাসুম বিল্লাহ শিশু তাসরিফার টনসিল অপারেশন করেন। দুপুর আড়াইটার দিকে তাকে হাসপাতালের বেডে নেওয়া হলে কিছুক্ষণ পর তার হাত-পা কাপতে থাকে এবং শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেস হতে থাকে। মেয়ের এমন করুন পরিনতি দেখে তার বাবা পারভেজ মিয়া ও মা পলি বেগম চিকিৎসক ও নার্সদের ডাকতে যান। চিকিৎসক না এলেও দুইজন নার্স এসে তাদের বলেন, এটা কোন সমস্যা নয়, ঠিক হয়ে যাবে। মডার্ণ হাসপাতালে শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতাল কতৃপক্ষ নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য শিশুকে চিকিৎসার জন্য কুমুদিনী হাসপাতালে রেফার করেন। শিশু তাসরিফার পরিবার তাকে কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসকগন তাকে মৃত ঘোষণা করে বলেন সে অনেক আগেই মারা গেছে। তাসরিফার বাবা-মা ও তার স্বজনরা আবার তাকে মডার্ণ হাসপাতালে নিয়ে এসে আহাজারি করতে থাকেন। এ সময় তাদের আহাজারিতে চারপাশের বাতাস ভারি হয়ে আসে। মডার্ণ হাসপাতালের চিকিৎসক, পরিচালক ও নার্সরা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরন করেন। ক্ষিপ্ত হয়ে মৃত শিশু তাসরিফার বাবা ও স্বজনরা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে ভাংচুরের চেষ্টা চালায়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন।
এ বিষয়ে গতকাল রাতে হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মাসুম বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, শিশুটির অপারেশন সঠিক ও ভাল ভাবে সম্পন্ন হয়। (আ্যানেসথেসিয়া জনিত) কারনে শিশুর মৃত্যু হতে পারে। বিভিন্ন অভিযোগের কথা তিনি অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে আ্যনেসথেসিয়া মো. সাইফ আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, রোগীর অপারেশনের পর জ্ঞান ফিরেছে। হয়তো অন্য কোন সমস্যায় তার মৃত্যু হয়েছে। এটা দেখার দায়িত্ব হাসপাতার কতৃপক্ষের এবং চিকিৎসকদের। অপর দিকে চিকিৎসক. আ্যানেসথেসিয়া ও হাসপাতার কতৃপক্ষের পরষ্পর বিরোধী বক্ত্য পাওয়ায় এই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর আগেও এই হাসপাতালে একই ঘটনা ঘটেছে।
এ ব্যাপারে আজ শনিবার হাসপাতালের পরিচালক মো. মোস্তফা মিয়া ও মো. আব্দুল হালিমের সঙ্গে বিস্তারিত জানতে মির্জাপুর মডার্ণ হাসপাতালে গেলে তাদের পাওয়া যায়নি। মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও তারা রিসিফ করেননি।
বিপুল অংকের টাকায় রফাদফার অভিযোগ ঃ- এদিকে শিশু তাসরিফার মৃত্যুর পর তার পরিবার ও স্বজনরা মির্জাপুর থানায় মামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। হাসপাতালে পরিচালক ও চিকিৎসকদের সিন্ডিকেট চক্র ঘটনা ধামাচাপা দিতে বিপুল অংকের টাকায় মৃত্যুর ঘটনাটি ধাপাচাপা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। শেষ পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি। রাতেই শিশুর মরদেহ তার স্বজনরা নিয়ে গেছেন।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের ব্যবস্থা গ্রহণঃ- উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পক্ষ থেকে আজ শনিবার সেনেটারি পরিদর্শিকা ইসরাত জাহান মির্জাপুর মডার্ন হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার (প্রাইভেট) পরিদর্শন করেছেন। তিনি হাসপাতালে এসে মৃত শিশুর ভর্তির রেজিস্টার ও কিছু আলামত সংগ্রহ করেছেন। এই প্রতিবেদন উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে দেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এ সময় হাসপাতালের কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং পরিচালককে দেখতে পাননি বলে জানান।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্যঃ- এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মির্জাপুর মডার্ন হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার (প্রাইভেট) হাসপাতালে তাসরিফা নামে এক শিশুর ভুল অপারেশনে মৃত্যু হয়েছে বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তারা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছেন। আগামীকাল রবিবার সিভিল সার্জন মহোদয়ের নির্দেশনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের বক্তব্য ঃ- এ ব্যাপারে মির্জাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ রাসেদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গতকাল শুক্রবার রাতে মির্জাপুর মডার্ণ ডায়াগনস্টিক সেন্টার (প্রাইভেট) হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। শিশুর পরিবারকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







