মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল
ছাত্রীদের যৌন হয়রাণী ও অর্থ আতœসাতের অভিযোগে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মির্জাপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হারুন অর রশীদকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কলেজ পরিচালনা পরিষদ। ২০১৯ সালে কলেজ চত্বরে খেলতে আসা দুই স্কুল ছাত্রীকে ডেকে নিয়ে যৌন হেনস্তার অভিযোগে ওই অধ্যক্ষকে সামযিক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এবার তিনি দ্বিতীয়বারের মত বরখাস্ত হলেন। গত ৮ মার্চ কলেজ পরিচালনা পরিষদের এক সভায় ৮ নম্বর রেজুলেশন অনুসারে তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১০ মার্চ তাকে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি দেওয়া হয়। বরখাতের প্রতিবাদে বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদ আজ শনিবার (২২ মার্চ) প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কলেজ পরিচালন পরিষদের সদস্য মো. ওয়াজ উদ্দিন, রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবর রহমান মিয়া, অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক জসিম উদ্দিন, দর্শন বিভাগের প্রভাষক আলাল উদ্দিন প্রমুখ। এর আগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কলেজের এডহক কমিটি বাতিলের জন্য তিনি জাতীয় বিশ^াবদ্যালয় বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে তার সম্পুর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ২০১৮ সালে সাজানো যৌন হয়রানির অভিযোগ আদালতে মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। আর আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা নিরুপনের জন্য প্রতিবছর অডিট করা হয়েছে। সেখানে কোন গড়মিল নেই। যে সাদিয়া সুলতানাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে তাকে আমি নিজে বরখাস্ত করেছি। তার স্বাক্ষরে কলেজের কোন চিঠি হতে পারেনা।
তিনি বলেন কলেজ পরিচালনা পরিষদ এখন এডহক কমিটি। কমিটির সভাপতি এবং বিদ্যুৎসাহী সদস্য ব্যাতিত বাকি সদস্যরা নিয়ম বহির্ভুতভাবে হয়েছে। যে কমিটির অধিকাংশ সদস্যই বৈধ না সেই কমিটির কোন কাজও বৈধ হতে পারেনা। যেখানে কমিটির বৈধতার নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে সেখানে তাদের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বৈধ হতে পারেনা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী এডহক কমিটি কলেজে কোন শিক্ষক নিয়োগ বা বরখাস্ত করতে পারেনা। তাই আমাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত সম্পুর্ণ বেআইনি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপত্রের পরিপন্থী।
মির্জাপুর মহিলা কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ও ভুক্তভোগি ছাত্রীরা জানায়, অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ কথায় কথায় ছাত্রীদের গায়ে হাত দেওয়ার অভ্যাস। দীর্ঘ দিন ধরে ছাত্রীদের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়ে যৌন হয়রাণী করে আসছে। ছাত্রীরা লজ্জায় প্রতিবাদ করতে পারেনি। তাছাড়া কলেজের কাগজপত্রে নয়-ছয় করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অনৈতিকভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আসছে। গত ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কলেজের ছাত্রীরা ফুসে উঠে অধ্যক্ষের অনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীরা যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় এবং স্মারকলিপি প্রদান করে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে কলেজ পরিচালন পরিষদ অধ্যক্ষকে সতর্ক করে এবং অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাকে কলেজ আসা থেকে বিরত থাকতে বলেন। এরই মধ্যে পরিচালনা পরিষদ কলেজর শিক্ষক সাদিয়া সুলতানাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করে। অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ এসবের তোয়াক্কা না করে মাঝে মঝেই কলেজে গিয়ে কাগজপত্র এবং হাজিরা খাতায় জোর পুর্বক স্বাক্ষর করা অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে কলেজের আর্থিক বিষয়ে নয়ছয়ের প্রমাণ পায় পরিচালনা পরিষদ। পরে কলেজ পরিচালনা পরিষদ এসব বিষয়ে একাধিকবার সভা করে অধ্যকে তিন বার চিঠি দেয় কারন দর্শানোর জন্য। অধ্যক্ষ চিঠির কোন জবাব দেননি। সর্বশেষ গত ৮ মার্চ কলেজ পরিচালনা পরিষদের এক সভায় অধ্যক্ষে বিরুদ্ধে যৌন ও আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং পরিচালনা পরিলনা পরিষদের সাথে ধৃষ্টতাপুর্ণ আচরনের জন্য তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ১০ মার্চ তাকে বরখাস্তের চিঠি দেওয়া হয়।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাদিয়া সুলতানা বলেন, পরিচালনা পরিষদ অধ্যক্ষে বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন। তদন্তেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগে সত্যতা পাওয়া গেছে। বার বার কারন দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। এজন্য পরিচালনা পরিষদ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ মো. হারুন অর রশিদ বলেন, আমাকে অন্যায় ও পরিকল্পিত ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমি কোন ছাত্রীকে যৌন হয়রানী করিনি এবং অর্থ আতœসাত করিনি। ছাত্রীরা মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। অবৈধ এডহক কমিটি বাতিলের জন্য গত ১৮ জানুয়ারি জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে লিখিত ভাবে আবেদন করেছি। আজ সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ জানিয়েছি।
মির্জাপুর মহিলা কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শিশু বিষযক সম্পাদক ও সাবেক এমপি মো. আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী বলেন, কলেজের পূর্ববর্তী পরিচালনা পরিষদ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন জন দেন। সেই তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে অধ্যক্ষ মো. হারুন অর রশীদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসন থেকেও তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। বিধি সম্মত ভাবেই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
মির্জাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. নজরুর ইসলাম বলেন, মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে অভিােযগ আসায় তদন্ত চলছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেলা প্রশাসক ও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়সহ উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।







